আর রাহীকুল মাখতূম বই রিভিউ

একটা সময় এসে আমি বুঝলাম, হযরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে যতটুকু জানা দরকার, তার সিকিভাগও আমি জানি না। ফলে পরামর্শ করলাম ইসলামী বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন কয়েকজনের সাথে, জানালাম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী (র.) রচিত ‘আর-রাহীকুল মাখতূম’ বইটা দিয়ে শুরু করতে চাচ্ছি। তাদের সবাই বেশ উৎসাহ দিলেন, জানালেন, বেস্ট স্টার্টিং পয়েন্ট এই বইটিই!

বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে এই ভরসা পেয়ে শুরু করে দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ্‌, কী চমৎকার একটা বই-ই না পড়লাম! নির্দ্বিধায় এই মহামানব সম্পর্কে যারা জানতে চান, তাদের জন্য বেস্ট স্টার্টিং পয়েন্ট এই বই, যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই উঠে এসেছে।

বইটা পড়ার সময় মনে হলো, নবীকে (সা) যেন চোখের সামনেই সবকিছু অর্জন করতে দেখছি। তাঁর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, মধ্যবয়স, ওহী লাভ, গোপনে ইসলামের পথে দাওয়াতের কার্যক্রম, দাওয়াত দিতে গিয়ে পদে পদে অত্যাচার, নির্যাতন, ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া, স্বগোত্রীয় ও আত্মীয়-স্বজনের চক্রান্তে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত- কতই না চমৎকার!

ঠিক এখানে এসেই থমকে যেতে হয়। এতদিন ধরে যে মুহাম্মাদ (সা) পদে পদে নির্যাতিত হয়েছেন, সঙ্গোপনে নিজের দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়েছেন, সেখানে মদীনায় এসে তিনি পেলেন সেখানকার অধিবাসীদের বুকভর্তি ভালবাসা, পেলেন দাওয়াতের উন্মুক্ত প্রান্তর, যদিও শত্রুর সংখ্যা এতে করে বাড়ে বৈ কমেনি।
মাদানী জীবন থেকে তাই দেখা গেল সমরনায়ক মুহাম্মাদের (সা) প্রতিকৃতি। বলতে দ্বিধা নেই, নিরীহ-নিরক্ষর এক এতিম বালক, যে কি না তারুণ্যে এসে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ করে সফলতা লাভ করেছিল, সেই তাঁর ভেতর থেকেই এমন দিগ্বিজয়ী সেনানায়কের আবির্ভাব আমাকে হতভম্ব করে তোলে।

কীচমৎকারভাবেই না প্রতিটা ব্যাটল স্ট্রাটেজি তৈরি করছেন; যেখানে মনে করছেন প্ল্যান-এ-তে হবে না, সেখানে প্ল্যান-বি, এমনকি প্ল্যান-সি পর্যন্ত তৈরি করছেন। সেই সাথে কোনো যুদ্ধেই যেন সীমা অতিক্রম করা না হয় সেই ব্যাপারে কড়াকড়ি নির্দেশনা তো আছেই।

হেরা গুহা থেকে শুরু। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কুরাইশদের আবির্ভাব, আবির্ভাব আশেপাশের অন্যান্য গোত্রেরও, যার পরিসমাপ্তি তৎকালীন পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নিজেদের মাথা না নোয়ানো অস্তিত্বের সগর্ব জানান দেয়ার মধ্য দিয়ে, যে অস্তিত্ব বলে যায়, “আমি আসছি… অন্ধকার দূর করতে… অসত্যকে দূর করতে…”

আর-রাহীকুল মাখতূম পড়ে জায়গায় জায়গায় পাঠক স্বীয় চোখকে যদি অশ্রুসজল হিসেবে খুঁজে পায়, তবে এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই, বরং এটাই স্বাভাবিক। বিশেষত বিদায় হজ্বের অধ্যায় থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মুহূর্তগুলো ছিল সবচেয়ে বেশি আবেগাক্রান্ত করার মতো অংশ।

বই সম্পর্কে ইতিবাচক অনেক কিছুই বলা হলো, এবার উন্নতির ক্ষেত্রের দিকে নজর দেয়া যাক।
১) মূল বইটি আরবিতে রচিত, যা পরে উর্দুতে, এবং সেখান থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত হয়ে আসে বলে বোঝা গেল। উল্লেখ্য, আমি পড়েছি তাওহীদ পাবলিকেশন্স থেকে বের হওয়া বইটি। এই তিন ধাপের মধ্য দিয়ে যাবার ফলে বইয়ের বিভিন্ন জায়গাতেই অনুবাদজনিত দুর্বোধ্যতা লক্ষ্যণীয়, যদিও সেই পরিমাণ কমই বলতে হবে। তারপরও এদিকে অর্থাৎ অনুবাদের ভাষাগত সৌন্দর্যের দিকে নজর দিলে বইটির এই দুর্বলতাটুকু খুব সহজেই দূরীভূত হয়ে যেত বলে মনে করছি।
অবশ্য অনুবাদের এই ক্ষেত্রবিশেষে কাঠিন্যের কারণ বুঝেছি পুরো বই পড়া শেষ করে ‘প্রথম প্রকাশকের নিবেদন’ পড়তে গিয়ে। সেখানে গিয়েই বুঝতে পারি যে বইয়ের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ ও বাকি অংশের অনুবাদক ভিন্ন দুজন ব্যক্তি। তবে বইটি পড়েননি এমন কেউ যেন মনে করবেন না যে অনেক কঠিন করে লেখা হয়েছে। না, সেটা মোটেও না। বরং বেশ সহজ আর সুন্দরই আছে। আমি আরও সুন্দর করার দিকে ইঙ্গিত করেই এই কথাটুকু বললাম।
২) বাক্যের আকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ বড় হয়ে গিয়েছে, যেখানে সেগুলোকে ভেঙে কয়েকটি বাক্যে ভাগ করে দিলে দিনশেষে পাঠকেরই বুঝতে সুবিধা হতো। বানান এবং ক্ষেত্রবিশেষে যতিচিহ্নে ভুল চোখে পড়েছে মাঝে মাঝেই। যত্নের দরকার এদিকটাতেও।
৩) আক্ষেপ লাগলো বইয়ের বিভিন্ন জায়গার কবিতাগুলো নিয়ে। তৎকালীন আরবের নানা কবিতাই বইটিতে চলে এসেছে ঘটনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে। কিন্তু সেসব এই বইয়ে এসেছে বিবৃতিমূলক বাক্য হিসেবে, পদ্য হিসেবে না একেবারেই। যদি এগুলোকে সেভাবে সাজিয়ে তোলা যেত, তাহলে কাব্যের রস-আস্বাদন বইটিকে আরও চমৎকার করে তুলতো।

হযরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে যারা স্কুল লেভেলের পাঠ্যবইয়ের বাইরে আরও গভীরভাবে এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতেই পড়া শুরু করতে চান, অর্থাৎ যারা আমার মতোই বিগিনার লেভেলে আছেন, তাদের জন্য ‘আর-রাহীকুল মাখতূম’ হতে পারে উৎকৃষ্ট জ্ঞানার্জনের মাধ্যম!

 

Reviewer: Brother Muhaiminul Islam Antik

Please put your valuable comment here (Leave a Reply)

%d bloggers like this: